তারুণ্য ধরে রাখতে খাদ্য তালিকায় রাখুন ৮টি ‘সুপারফুড’
বয়স বৃদ্ধি জীবনের এক চরম ও
অমোঘ সত্য। তবে সময়ের চাকা ঘুরলেও নিজের চিরচেনা তারুণ্য ও ত্বকের সতেজতা কে না ধরে
রাখতে চায়! অনেকেই বয়সের এই ছাপ লুকাতে বাজারে প্রচলিত দামি দামি ক্রিম, লোশন কিংবা
সেরামের ওপর অন্ধের মতো ভরসা করেন। কিন্তু রূপবিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের মতে, ভেতর থেকে
সঠিক পুষ্টি না পেলে শুধু বাইরের কৃত্রিম যত্ন ত্বককে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সুন্দর রাখতে
পারে না।
প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি
প্রভাব পড়ে আমাদের ত্বকের নমনীয়তা, কোলাজেন উৎপাদন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। মূলত
শরীরে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ বা কোষের ক্ষয় এবং ‘ইনফ্লামেশন’ বা
প্রদাহ হলো দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। কিছু খাবার এই ক্ষয় রোধ করে তারুণ্য ধরে
রাখতে জাদুর মতো কাজ করে, আবার কিছু খাবার বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে দ্বিগুণ ত্বরান্বিত
করে।
তারুণ্য
ধরে রাখতে যা খাবেন:
প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,
ভিটামিন এবং সুস্থ চর্বিসমৃদ্ধ খাবারগুলো আমাদের শরীরের কোলাজেন ধরে রাখতে এবং কোষ
পুনর্গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
ব্রকলি: একে
পুষ্টির ‘পাওয়ার হাউস’ বলা হয়। এই ক্রুসিফেরাস সবজিটি
ভিটামিন ‘সি’ এবং
‘কে’-তে
ভরপুর। ভিটামিন ‘সি’ ত্বকের প্রধান প্রোটিন কোলাজেন
তৈরিতে সাহায্য করে, যা ত্বককে রাখে টানটান। এ ছাড়া এর ক্যালসিয়াম হাড় ভালো রাখে এবং
‘লুটেন’ নামক
উপাদান মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়।
লাল
ক্যাপসিকাম: এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের খনি। এতে রয়েছে প্রচুর
‘ক্যারোটিনয়েড’,
যার প্রদাহবিরোধী গুণ সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখে।
পালংশাক: ত্বকের
আর্দ্রতার আসল উৎস এই শাক। এটি শরীরকে চমৎকারভাবে হাইড্রেটেড বা সজল রাখে। ভিটামিন
এ, সি, ই, কে এবং আয়রনসমৃদ্ধ পালংশাক কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। এর ভিটামিন ‘এ’ চুলের
স্বাস্থ্যও দারুণ ভালো রাখে।
মিষ্টিআলু: মিষ্টিআলুর
চমৎকার কমলা রঙের উৎস হলো ‘বিটাক্যারোটিন’। আমাদের শরীর এটিকে ভিটামিন
‘এ’-তে
রূপান্তর করে, যা ত্বকের ইলাস্টিসিটি বা নমনীয়তা ফিরিয়ে আনে এবং মরা কোষ দূর করে নতুন
কোষ গজাতে সাহায্য করে।
অ্যাভোকাডো: শরীরে
সুস্থ চর্বির জাদুকরি প্রভাব ফেলতে পারে এই ফল। এতে রয়েছে প্রচুর ফ্যাটি অ্যাসিড, যা
শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমায়। বিশেষ করে নারীদের নিয়মিত অ্যাভোকাডো খাওয়ার ফলে ত্বকের
উজ্জ্বলতা দ্রুত বাড়ে।
পেঁপে: হজম
ও রোগ প্রতিরোধে অনন্য এই ফলটিতে থাকা ‘প্যাপেইন’ নামের এনজাইমটি হজমশক্তি
বাড়ায়। এর গাঁজন করা নির্যাস আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো বয়সজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক
ভূমিকা পালন করে।
বাদাম: কাঠবাদাম
ও আখরোটের ভিটামিন ‘ই’ ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে।
আখরোটে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের কোষের ঝিল্লি মজবুত করে। তবে বাদাম সবসময়
খোসাসহ খাওয়া উচিত, কারণ খোসা ফেলে দিলে এর অর্ধেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টই নষ্ট হয়ে যায়।
ডালিমের
দানা: কোষের শক্তিবর্ধক হিসেবে ডালিম অতুলনীয়। এতে থাকা ‘পুনিক্যালাজিন’ এবং
‘ইউরোলিথিন এ’ নামক
যৌগ শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির
ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।
বয়স
দ্রুত বাড়িয়ে দেয় যে ক্ষতিকর খাবার:
খাবারে থাকা অতিরিক্ত চিনি
যখন প্রোটিন বা চর্বির সঙ্গে মিশে যায়, তখন ‘গ্লাইকেশন’ প্রক্রিয়ার
মাধ্যমে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। এটি ত্বকের মূল ভিত্তি কোলাজেন ও ইলাস্টিন ধ্বংস করে
আমাদের দ্রুত বুড়িয়ে দেয়। তাই খাদ্যতালিকা থেকে অবিলম্বে বাদ দেওয়া উচিত কিছু খাবার:
ভাজাপোড়া
ও অতিরিক্ত ঝাল খাবার: উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা খাবার শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যাল
তৈরি করে, যা ডিএনএর ক্ষতি করে এবং ত্বকে দ্রুত বলিরেখা ফেলে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঝাল
খাবার রক্তনালির প্রসার ঘটায়, ফলে মুখে লালচে বা বেগুনি দাগ পড়তে পারে।
চিনি
ও ডালডা: কোলাজেন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে চিনি।
ফলে ত্বক ঝুলে পড়ে এবং ব্রণের সমস্যা বাড়ে। আবার ডালডায় থাকা ট্রান্সফ্যাট শরীরে খারাপ
কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং সূর্যের আলোর প্রতি ত্বককে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
প্রক্রিয়াজাত
মাংস ও পোড়া গ্রিল: প্রক্রিয়াজাত মাংসে প্রচুর সোডিয়াম ও সালফাইট
থাকে, যা ত্বককে পানিশূন্য করে দেয়। উচ্চ তাপমাত্রায় কয়লায় পোড়ানো বা গ্রিল করা মাংস
ধমনি শক্ত করে ফেলে এবং শরীরে এমন কিছু উপাদান তৈরি করে, যা মানসিক অবসাদ ও আলঝেইমারের
ঝুঁকি বাড়ায়।
কোমল
পানীয়, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল: কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকস
অতিরিক্ত চিনিযুক্ত হওয়ায় শরীরের কোষের বয়স দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। ক্যাফেইন শরীর পানিশূন্য
এবং ত্বক শুষ্ক করে। অ্যালকোহল শরীরের ভিটামিন ‘এ’ এবং পুষ্টি উপাদান
ধ্বংস করে নতুন কোষ গঠনে বাধা দেয়।
তারুণ্য ধরে রাখার মানে এই
নয় যে আপনি পছন্দের সব খাবার চিরতরে বন্ধ করে দেবেন। আসল চাবিকাঠি হলো একটি সুষম ও
বৈজ্ঞানিক ডায়েট চার্ট মেনে চলা। ক্ষতিকর প্রক্রিয়াজাত খাবার বা ভাজাপোড়া এড়িয়ে প্লেটে
যত বেশি রঙিন সবজি আর ফলমূলের জায়গা দেবেন, আপনার ত্বক ও শরীর তত দীর্ঘ সময় ধরে সটেজ
ও চিরসবুজ থাকবে।
সূত্র: হেলথ লাইন ও গুড ফুড।
No comments yet
Be the first to join the discussion.