রোনালদোর বিশ্বকাপ মিশন শুরু
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে যতটা আলোচনা ছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপেও দৃশ্যপট খুব একটা বদলায়নি।
তবে পার্থক্য একটাই- এবার তার বয়স ৪১। তবুও পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্বপ্নের কেন্দ্রে
রয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা।
উত্তর আমেরিকার মাটিতে শুরু
হওয়া বিশ্বকাপটি রোনালদোর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এর আগে কোনো ফুটবলার ছয়টি বিশ্বকাপে
খেলার কীর্তি গড়তে পারেননি। তবে এবার শুধু রোনালদো নয়, মোট তিনজন ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে
এসেছেন। বাকি দুজন লিওনেল মেসি ও মেক্সিকোর গুইলার্মো ওচোয়া।
যদিও মেসি এরই মধ্যে মাঠে নেমে
ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শুরু করেছেন। মেক্সিকো এক ম্যাচ খেললেও ওচোয়া মাঠে নামেননি। রোনালদো
আজ মাঠে নামবেন আফ্রিকান প্রতিনিধি ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় শুরু
হবে ম্যাচ।
এবারের বিশ্বকাপ আসরটি শুধু
পর্তুগালের জন্য নয়, রোনালদোর ব্যক্তিগত ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পর্তুগাল
দলে রোনালদোর জায়গা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য থামেনি। অনেকের মতে, তিনি এখনও দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য
গোলস্কোরার। আবার সমালোচকদের একাংশ বিশ্বাস করে, রোনালদোর উপস্থিতি দলের স্বাভাবিক
ছন্দ ও আক্রমণাত্মক স্বাধীনতা সীমিত করে ফেলে।
তবে প্রধান কোচ রবার্তো মার্টিনেজ
এসব বিতর্ক গুরুত্ব দিতে নারাজ। তার দাবি, রোনালদো শুধু নামের কারণে নয়, নিজের পারফরম্যান্সের
জোরেই দলে জায়গা ধরে রেখেছেন।
এখনও
গোলের মেশিন
সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরে
খেললেও রোনালদোর গোল করার ক্ষুধা এতটুকু কমেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা
তিনি। পর্তুগালের হয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ১৪৩টি।
রবার্তো মার্টিনেজ দায়িত্ব
নেওয়ার পর থেকে ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল করেছেন রোনালদো, যা প্রমাণ করে বয়স বাড়লেও গোল করার
দক্ষতায় ভাটা পড়েনি।
বর্তমানে ক্যারিয়ারে এক হাজার
গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার খুব কাছাকাছি অবস্থানে তিনি। সেই অবিশ্বাস্য অর্জন থেকে
মাত্র ১৭ গোল দূরে রয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।
সমালোচনার
মুখে মার্টিনেজ
রোনালদোকে ঘিরে শুধু বিতর্কই
নয়, সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে কোচ মার্টিনেজকেও। ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে
বিদায়ের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত প্রতিভাবান দল নিয়েও কেন শিরোপা জেতা গেল না?
ওই টুর্নামেন্টে পাঁচ ম্যাচের সবকটিতেই রোনালদোকে শুরু থেকে খেলান মার্টিনেজ। কিন্তু
তিনি একটি গোলও করতে পারেননি।
তবে সমালোচকদের জবাব হিসেবে
২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগ শিরোপা জয়ের উদাহরণ সামনে আনছেন এই স্প্যানিশ কোচ। ফাইনালে
স্পেনের বিপক্ষে গোল করে পর্তুগালকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রোনালদো।
এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তার
তৃতীয় আন্তর্জাতিক শিরোপা। এর আগে ইউরো ২০১৬ এবং ২০১৯ নেশন্স লিগ জিতেছিলেন তিনি। শিরোপা
জয়ের পর আবেগাপ্লুত রোনালদো বলেছিলেন, ‘ক্লাব পর্যায়ে অনেক ট্রফি জিতেছি, কিন্তু পর্তুগালের
হয়ে জেতার আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। এটা শুধু আনন্দ নয়, এটা মিশন পূরণের
অনুভূতি।’
সতীর্থদের
আস্থা
রোনালদোকে নিয়ে বিতর্ক থাকলেও
সতীর্থরা এখনও তার ওপর আস্থা রাখছেন। পিএসজির মিডফিল্ডার ভিতিনহা রোনালদোর সঙ্গে খেলার
অভিজ্ঞতা ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি ফুটবল ইতিহাসের
অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তার সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করতে পারাটা গর্বের। প্রতিদিন
তার পেশাদারত্ব কাছ থেকে দেখছি, শিখছি। আমরা চাই তার সঙ্গে এবং তার জন্য বিশ্বকাপ জিততে।’
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা
ব্রুনো ফার্নান্দেজও রোনালদোর পক্ষে কথা বলেন। ব্রুনো বলেন, ‘অনেকে মনে করে রোনালদো
না থাকলে আমরা আরও স্বাধীনভাবে খেলতে পারি। কিন্তু সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটাও
আমাদের ব্যর্থতা। কারণ ক্রিস্টিয়ানো এখনও আমাদের অনেক কিছু দিতে পারেন।’
শক্তিশালী
পর্তুগাল
রোনালদোকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও
এবারের পর্তুগাল দলকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী স্কোয়াড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রুনো ফার্নান্দেজ দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। অন্যদিকে পিএসজির ভিতিনহা, হোয়াও নেভেস
ও নুনো মেন্দেস বর্তমানে নিজেদের পজিশনে বিশ্বের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচিত। তাই
অনেকের মতে, পর্তুগালের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা এবার আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
শুরু
কঙ্গোর বিপক্ষে
বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘কে’-তে
পর্তুগালের প্রথম প্রতিপক্ষ ডিআর কঙ্গো। ১৭ জুন (আজ) নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু
করতে যাচ্ছে ইউরোপের এই দলটি। এরপর ২৩ জুন উজবেকিস্তান এবং ২৮ জুন কলম্বিয়ার মুখোমুখি
হবে তারা।
বিশ্বকাপের সূচি, বয়স কিংবা
ক্লান্তি- কোনো কিছুই রোনালদোকে থামাতে পারবে না বলেই বিশ্বাস করেন কোচ মার্টিনেজ।
এবারের বিশ্বকাপ হয়তো রোনালদোর শেষ সুযোগ। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং নেশন্স লিগ জয়ের
স্বাদ তিনি পেয়েছেন। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি বিশ্বকাপ এখনও অধরা।
তাই উত্তর আমেরিকার মাটিতে
৪১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির সামনে এখন একটাই লক্ষ্য- ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটা স্মরণীয়
করে তোলা এবং পর্তুগালকে এনে দেওয়া ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা।
No comments yet
Be the first to join the discussion.